ঈশ্বর গুপ্ত তাঁর মাসপয়লা ‘সংবাদ
প্রভাকরে’ যে সমস্ত কবিওয়ালার জীবনী ও কবিগান সংগ্রহ করেছিলেন তাতে সপ্তমী,
সখীসংবাদ, ও বিরহের গানই সংগ্রহ করেছিলেন। গান গাওয়া আর পাঠ করবার রীতি সম্পর্কে
বলেন-
“হাফ আখড়াই,দাঁড়া সখের কবি ও পেসাদারি কবিতার গাহনার প্রনালী একপ্রকার।কিছুমাত্রই ভেদ নাই। প্রথমে ‘চিতেন’, পরে ‘মহড়া’ সর্বশেষে ‘অন্তরা’ গাহিতে হয়, কিন্তু লিখনকালে অগ্রে ‘মহড়া’, পরে ‘চিতেন’, শেষে ‘অন্তরা’ লিখিতে হইবে।”
রুচির স্থূলতা দোষের কারনেই
তিনি খেউড়ের বিশেষ উল্লেখ করেননি। অনেকে গুপ্ত কবির অমার্জিত রুচির নিন্দা করে
থাকেন।কিন্তু কবিগান মুদ্রিত করতে গিয়ে তিনি অশ্লীল খেউরগান বাদ দিয়েছিলেন, এতে
তাঁর মার্জিত রুচির প্রমাণই পাওয়া গেছে। অবশ্য রুচির মর্যাদা রাখতে গিয়ে তিনি যা করেছেন তা কবিগানের
ইতিহাসের এক অপূরণীয় ক্ষতি বলেই আমি মনে করি। কারন খেউড়গানে রুচির ইতরতা সত্ত্বেও
এখানে কবিয়ালদের পৃথক পৃথক ব্যক্তিত্বের তির্যকতা প্রকাশ পায়।
কবিগানের আসরে দুদল অবতীর্ন
হয়ে যেভাবে একদল গান শুরু করত, আরেকদল গান গাইতে উঠে তার জবাব দিত, এইভাবে কবিতার
সংগ্রামে যে উত্তেজনা সৃষ্টি হত , তা ঈশ্বর গুপ্ত বা পরবর্তী কারও সংগ্রহ থেকেই
সেই স্বাদ পাওয়া যায় না।
ঈশ্বর গুপ্ত সংগৃহীত গানগুলিকে
মহড়া, চিতেন, আর অন্তরায় ভাগ করেন; ১৮৭৭-৭৮ সাল নাগাদ প্রকাশিত গোপালচন্দ্র
বন্দ্যোপাধ্যায় সঙ্কলিত ও প্রকাশিত ‘প্রাচীন কবিসংগ্রহে সর্বপ্রথম ঈশ্বর গুপ্ত
নির্দিষ্ট উপচ্ছেদগুলিকে আরো বিশ্লিষ্ট করে অনেকগুলি উপচ্ছেদে ভাগ করেন।পরবর্তিতে
মনুলাল মিশ্র বিষয় সজ্জায় কিঞ্চিৎ নতুনত্বের উল্লেখ করেন- মহড়া –খাদ –মেলতা –চিতেন
–পাড়ন –ফুকা -মেলতা। মার্গ রীতির সঙ্গীতের যেমন অস্থায়ী, সঞ্চারী, অন্তরা, আভোগ
ইত্যাদি উপচ্ছেদ আছে, কবিগানেও সেই ধরনের রীতি লৌকিক নামে অভিহিত আছে। এগুলির
আক্ষরিক ও প্রতীয়মান অর্থ এখন আমাদের কাছে কখন দুর্বোধ্য, কখনও বা অর্থহীন মনে হয়।
কিন্তু সে যুগের কবিওয়ালা, বাঁধনদার, ও শ্রোতারা চিতেন- মহড়া- খাদ- ফুকা- মেলতার
রূঢ়ি অর্থ নিশ্চয়ই বুঝতেন। প্রথমদিকে কবিগানের পংক্তি বিন্যাসে জটিলতা ছিল না,
কিন্তু কালক্রমে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষে কবিগানে জটিলতা আসতে শুরু করে।
বাংলার পুর্ব ও
দক্ষিনপুর্বাঞ্চলে পরবর্তীকালে যে কবিগান প্রচলিত হয়, তার পংক্তিবিন্যাসেও কিছু
নতুনত্ব আছে।যশোহর খুলনার কবিগানের পংক্তিবিন্যাসের নামঃ চিতান, পরচিতান,পড়তা, ১ম
ফুকর, মুখ, পেঁজ, খোঁজ, ২য় ফুকর, পরফুকর,পরখোঁজ, অন্তরা। বিক্রমপুর অঞ্চলের রীতির
নাম হল চিতান, পরিচিতান, মিল্মহড়া, ধুয়া, খাদ, লহর, ঝুমুর। কেউ কেউ অনুমান করেন যে
এই বিচিত্র নামগুলি পাঁচালীগানের উদ্গ্রাহক, মেলাপক, আভোগ, ধ্রুবপদ ও অন্তরা থেকে
পরিকল্পিত হয়েছে। কবিগানের পংক্তিবিন্যাস অঞ্চল ভেদে বিভিন্ন নাম গ্রহন করেছে।
পংক্তিবিন্যাস ও মিত্রাক্ষরের রীতিও সর্বত্র এক নয়।
আবারও একটু কব্বিগানের
বিষয়বস্তুর কথায় আসব । ঈশ্বর গুপ্ত গানগুলিকে ভবানীবিষয়(সপ্তমী), সখীসংবাদ, বিরহ, খেউড়,
লহর এই পঞ্চাঙ্গে বিভক্ত করেছিলেন। ভবানীবিষয়ক গানে ছিল দেবী বন্দনা আর আগমনী গান।
সখীসংবাদ ছিল বৈষ্ণব পদাবলী আশ্রয়ী। বিরহে ছিল সাধারন নরনারীর মানবীয় বিরহবেদনা। সপ্তমী-
সখীসংবাদ-বিরহ গানেও হারজিত ছিল।একদল যখন গানে গানে ‘চাপান’ দিতেন, আরেকদল গানে
গানেই তার ‘উতোর’ দিতেন, তখন তাদের গানে শাস্ত্রজ্ঞান, সরসতা, তীক্ষ্ণবুদ্ধি,
এমনকি স্বাভাবিকত্বও প্রকাশ পেত। কিন্তু সাধারন শ্রোতারা এ রসের বিশেষ পরোয়া করত
না, তারা খেউর আর লহর শোনবার জন্য উৎকণ্ঠিত হত।এই দুই পর্যায় কবিগানের শেষ অঙ্গ।
ঘুমে চোখ ঢুলু ঢুলু হলে, দর্শকের ঘুম কাটিয়ে দিত উচ্চবাদ্য যন্ত্র সহযোগের এইসব
হাল্কা চালের অশ্লীল গান।
চিত্র উৎস- ঈশ্বর গুপ্তের ছবি ইন্টারনেট থেকে গৃহিত।
তথ্যসুত্র-
১)History of Bengali Language and Literature - D.C. Sen.
2) বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত( ৪র্থ খন্ড)- অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়
৩)পূর্ববঙ্গের কবিগান- ডঃ দীনেশ চন্দ্র সিংহ
৪) প্রাচীন কবিওয়ালার গান- প্রফুল্লচন্দ্র পাল।
সহযোগিতায়- রবীন্দ্রভারতী সেন্ট্রাল লাইব্রেরী আর RKMIC লাইব্রেরী।
১)History of Bengali Language and Literature - D.C. Sen.
2) বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত( ৪র্থ খন্ড)- অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়
৩)পূর্ববঙ্গের কবিগান- ডঃ দীনেশ চন্দ্র সিংহ
৪) প্রাচীন কবিওয়ালার গান- প্রফুল্লচন্দ্র পাল।
সহযোগিতায়- রবীন্দ্রভারতী সেন্ট্রাল লাইব্রেরী আর RKMIC লাইব্রেরী।

খুব সুন্দর ও তথ্য সমৃদ্ধ...
ReplyDelete