কাব্য সাহিত্যের
অঙ্গনে কবিগানের অবাধ প্রবেশাধিকার ঘটেছে এর বিষয়বস্তু বৈচিত্র ও আঙ্গিকের
কলাচাতুর্যের জন্য।এ গান একইসঙ্গে গ্রাম্য
গান আবার নাগরিক শিল্প; লোকগীতির অন্তর্ভুক্ত, আবার ভব্য সাহিত্যেরও আত্মীয়;
গীতাত্মক আবার কবিতাত্মক; দেবদেবীর লীলারসে পূর্ণ,আবার বাস্তব জীবনের রঙ্গরসে
উতরোল; কখনও বিশুদ্ধ ভক্তির গান, কখন মানবীয় প্রীতিরসে পূর্ন; কখনও সুস্নিগ্ধ
মহত্বব্যঞ্জক, কখনও অতি জঘন্য ইতরতায় পর্যুসিত।এর মূল গ্রামবাংলায়, কিন্তু
শাখাবিস্তার শহরে।এর রচনাকার ও গায়ক কখনও বর্ণজ্ঞানহীন অন্ত্যজ ব্যক্তি, কখন সুশিক্ষিত ভদ্র
সম্প্রদায়।এর ভাষায় ও রচনায় কখনও নিপুনতা, ছন্দে দক্ষতা; কখনও বা হানিকর অজ্ঞতা,
উদাসীন অবহেলা,অশিষ্ট ভাঁড়ামি, ব্যকরণ-অভিধানের মুন্ডুপাত। কবিগান হাল আমলের
সামগ্রী নয় বা ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির চেষ্টায় গড়েওঠা কোলকাতা শহরও এর জন্মনীড় নয়।
গ্রামবাংলার ভাবভঙ্গী, গানবাজনা, মন ও আবেগ প্রভৃতির উপর ভিত্তি করে কবিগান প্রথম
গ্রামেই ভূমিষ্ঠ হয়েছিল এবং গোড়ার দিকে এ-গান মূলত লোকসাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল;
ঝুমুর ও যাত্রা-পাঁচালীর সঙ্গেই ছিল এর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তা।
কবিগানের উগ্র
আদিরসের দিকটি কৃষনগর, নবদ্বীপ ও শান্তিপুরের শিক্ষিতসমাজেই প্রথম প্রচারিত
হয়েছিল-অনুমান অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে। এর উদ্দেশ্য ছিল নিছক গানবাজনা
সংক্রান্ত আমোদপ্রমোদ; এতে দেবদেবীর কথা থাকলেও তার পরিমান ছিল সামান্য।অলসবিলাসী
ধনীসমাজ ও কৃষ্ণনগরের দরবারি আদর্শে পরিপুষ্ট নাগরিকেরা এই ধরণের গান থেকে
আদিরসের-ফোড়ন দেওয়া রিপুর উত্তেজনা চাইত। সুতরাং এই গানের স্বরূপ পুরোটা না জানলেও আন্দাজ করতে অসুবিধা
হয় না।
অষ্টাদশ শতাব্দীর
শেষার্ধ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর তৃতীয়-চতুর্থ দশক পর্যন্ত দেখা যায়, কোলকাতা ও তার
চারপাশে গাঙ্গেয় অঞ্চলে যে সমস্ত কবিওয়ালা গান রচনা করে বা মাইনেকরা বাঁধনদারের
গান গাইতে লাগলেন, তাদের বিষয়বস্তু সম্পর্কে প্রথম তথ্য পাওয়া যায় জয়নারায়ণ
ঘোষালের ‘করুনানিধানবিলাসে’; এই গ্রন্থের মতে সেযুগে(অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধ
থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে) কবিগান দুদলের মধ্যে তিনরাত্রি ধরে অনুষ্ঠিত হত।
রচনার পরিপাট্য এবং সঙ্গীতের উতকর্ষানুসারে দুদলের মধ্যে জয় পরাজয় নির্ধারিত হত।
প্রথমে এ গান নিছক বৈষ্ণব সঙ্গীতের বা কীর্তনের দ্বারা প্রভাবিত ছিল।
“ তিনরাত্র কবি গায় দু’ দল হইয়া।
হারিজিতি শব্দগু’ণে শুনে মন দিয়া।।
গোপীতে করিল সৃষ্টি কবির কীর্ত্তন।।
অদ্যবধি সেই গান করে নরগণ।।”( ‘করুনানিধানবিলাস’ থেকে উদ্ধৃত)
‘করুনানিধানবিলাস’ প্রায় ঈশ্বর গুপ্তের সংগ্রহের ৩০ বছর আগের কথা, কিন্তু তাঁর এই সংগ্রহের ১৭-১৮ বছর আগে ফিরিঙ্গী সংবাদপত্র ‘ইংলিশম্যানে’ (13th January, 1837) “হিন্দু” নামক নিবন্ধে কবিগানের দল ও আঙ্গিকের সংক্ষিপ্ত পরিচয় মুদ্রিত হয়েছিল; এই বর্ননা থেকে আন্দাজ করা যায়, দেবদেবীর পূজানুষ্ঠানে যে কবি অনুষ্ঠিত হত তার সবটাই ছিল অশিক্ষিত জনচিত্তের উপযোগী- “ The Cobbeas are a species of wild song, which exceedingly minister to the gratification of mob.”
কোন ধনীব্যক্তির বাড়ির
প্রাঙ্গনে রাত নটা-দশটার সময় কবিগান অনুষ্ঠিত হত। এত লোক জড়ো হতো যে উদ্যোক্তাদের
পথে ভিড় সামলানো দুরূহ হতো। এমনকি ভিড় সামলানোর জন্য বেপরোয়া চাবুকও চালাতে হত।
এতিমধ্যে ঢুলিরা ঢোলে ঘা দিলেই সভা যেত জমে। চারপাশের হৈ চৈ থিতিয়ে গেলে
কবিতাওয়ালাদের প্রথম দল সংখ্যায় ১৩-১৪ জন, কোমর থেকে হাঁটু পর্যন্ত লাল কাপড়ে ঢেকে,
মাথায় পাখির পালক যুক্ত তেকোনা টুপি পড়ে, দুপায়ে নুপুর বেঁধে ঝুম ঝুম শব্দে
একেবারে আদুড় গায়ে প্রাঙ্গনের মাঝঘানে অবতীর্ন হত।
(মোট শব্দ সংখ্যা-৪৪৭টি।)
তথ্যসুত্রঃ-
- কবিগান- দীপক বিশ্বাস
- বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত(৪র্থ খন্ড)-অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়
- করুনানিধানবিলাস- জয়নারায়ণ ঘোষাল
- ইংলিশম্যান পত্রিকা (13th January, 1837)



No comments:
Post a Comment