Monday, 23 November 2015

কবিগান৮ঃ- কবিয়াল কথা ৩



তৃতীয় পর্ব- আধুনিক যুগের গ্রামীন কবিগান
উনবিংশ শতাব্দীর নবযুগের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রবলতা যতই বৃদ্ধি পেতে লাগল, ততই লোকরঞ্জনের এই সুলভ পন্থাও বিরল পথিক হয়ে পড়ল।একালের কবিয়ালদের সকলেই গ্রামে আবির্ভুত হলেও আধুনিক ভাবাদর্শেই লালিত হয়েছেন।এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য- চট্টগ্রামের রমেশ শীল, জিন্দেগীর শেখ গোমহানী দেওয়ান, শ্রীহট্টের প্রসন্ন কুমার চন্দ, ফনীন্দ্রচন্দ্র দাস, নদীয়ার কয়েকজন কবিয়াল উল্লেখ্য।পুরাতন কবিগানের বেশিরভাগ ঐতিহ্য আর এদের গানে নেই, বরং উঠে এসেছে স্বাধীনতা সংগ্রাম, কৃষি বিপ্লব, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অন্দোলন। অশ্লীল ইতরতা থেকেও এদের গান মুক্ত।

“ কানের গান আর দরকার নেই ভাই, প্রাণের গান গাইতে হবে,”- শেখ গোমহানী দেওয়ান



এই আধুনিক কবিয়ালদের গানে আধুনিকতার রস মিশেছে সত্য কিন্তু কতটা নতুনত্বে বৈচিত্রমন্ডিত হয়েছে, তা নিয়ে মতান্তর আছে।

পুর্ব বঙ্গের গ্রামীন কবিগান.........
পুর্ববঙ্গের মধ্যে ময়মনসিংহ ও ঢাকা বিক্রমপুরে শতাধিক বছর আগে কবিগানের বিশেষ প্রচলন হয়েছিল। ময়মনসিংহের কানাই-বলাই ভাতৃত্বয় কবিগানে বিশেষ খ্যাতিলাভ করেছিলেন এবং ভক্তিমুলক মালসী গানে (ভবানী বিষয়ক) প্রতিভার পরিচয় দিয়েছিলেন। নেত্রকোনার এক মুসলিম কবিয়াল লালমামুদও কবিগানে  স্মরণীয় হয়ে আছেন। কৃষ্ণের বাঁশী শুনে রাধার উন্মনা ভাবটা তিনি চমৎকার ফুটিয়েছেন-



“ সুধা বিষে আছে মিশে বাশীর রবে।
  আমার যে যন্ত্রনা,
  প্রাণ জানে আর কেউ জানে না-
  বল সখি, কি উপায় হবে।”

 
পরবর্তিকালে ঢাকার হরিচরণ আচার্য খুব বিখ্যাত হন। ইনি একদিকে যেমন রাধাকৃষ্ণ ইত্যাদি দেবদেবী বিষয়ক গান রচনা করেন, তেমনই আবার হিন্দু মুসলমান দাঙ্গা কিংবা দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের কারাবরণও তাঁর গানে উঠে আসে। 
 তথ্যসুত্র-
১)History of Bengali Language and Literature - D.C. Sen.
2) বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত( ৪র্থ খন্ড)- অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়
৩)পূর্ববঙ্গের কবিগান- ডঃ দীনেশ চন্দ্র সিংহ
৪) প্রাচীন কবিওয়ালার গান- প্রফুল্লচন্দ্র    পাল।
সহযোগিতায়- রবীন্দ্রভারতী সেন্ট্রাল লাইব্রেরী আর RKMIC লাইব্রেরী।

 
চিত্র উৎস- ইন্টারনেট।


 





Thursday, 12 November 2015

কবিগান ৭ঃ- কবিয়াল কথা ২



দ্বিতীয় পর্ব(ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ)
আমরা আগের ব্লকে অষ্টাদশ শতাব্দী  থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশক পর্যন্ত প্রধান কয়েকজন কবিওয়ালাদের জীবন আলোচনা করলাম। এবার আমরা আসব ঊনবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকের পরের কবিয়াল দের কথায়-
যজ্ঞেশ্বরী
প্রথমেই একজন স্ত্রী কবিয়ালের নাম উল্লেখ করলাম, যদিও তাঁর সম্মন্ধে বিশেষ কোনো তথ্য পাওয়া যায় না, শুধুমাত্র এইটুকু জানা যায় তিনি নিজে কবিগান রচনা করতেন এবং দল গড়ে পুরুষ কবিওয়ালাদের সাথে রীতিমত লড়াই করতেন।এঁনাকে সেই যুগে অনেকেই ‘রাম বসুর গার্লফ্রেন্ড’ বা প্রনয়িনী বলতেন জানা যায়। তার রচিত একটি গান নিচে দিলাম, যাতে নারীর মনোব্যথা অত্যন্ত স্বাভাবিক ভাবে তির্যক ব্যঙ্গের অম্লাক্ত রস মিশিয়ে বলা হয়েছে-
  ১ চিতান।। কর্ম্মক্রমে আশ্রমে সখা হলে যদি অধিষ্ঠান;
১ পরচিতান।। হেরে মুখ, গেল দুখ, দুটো কথার কথা বলি প্রাণ।।
  ১ ফুকা ।। আমায়  বন্দী করি প্রেমে, এখন ক্ষান্ত হলে হে ক্রমে ক্রমে,
          দিয়ে জলাঞ্জলী দিয়ে আশ্রমে।
 ১ মেলতা।। আমি কুলবতী নারী পতি বই আর জানিনে,
          এখন অধীনী বলিয়ে ফিরে নাহি চাও।
    মহড়া।। ঘরের ধন ফেলে প্রাণ, পরের ধন আগুলে বেড়াও।
          নাহি চেন ঘর-বাসা, কি বসন্ত কি বরষা,
                   সতীরে করে নিরাশা অসতীরে আশা পূরাও।



ভোলা ময়রা

উত্তরকালে ভোলা ময়রা কবিয়াল হিসাবে অত্যন্ত খ্যাতিলাভ করেন। তিনি নিজের পরিচয় বিভিন্ন ভাবে নিজেই দিয়েছেন,কিন্তু এ সমস্ত উক্তির যতার্থতা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে লোকশ্রুতি যেখানে একমাত্র প্রমান, সেখানে নানা ধরনের কথা ওঠা স্বাভাবিক। কিছু উদাহরন নিচে দিলাম-


‘আমি সে ভোলানাথ নইরে আমি সে ভোলানাথ নই,
আমি ময়রা ভোলা      ভিঁয়াই খোলা
       বাগবাজারে রই।’

অথবা



‘আমি ময়রা ভোলা        হরুর চেলা

         বাগবাজারে রই


ভোলা  ময়রা ৭০-৭২ বছর বেঁচে ছিলেন,কিন্তু তার নিজের গান রচনা বলতে কিছু লহরের গানই আমরা পাই, বলতে গেলে এই লহরের গানই তাকে জয়মাল্য এনে দিত। এমনিতে তিনি সুরসিক পুরুষ ছিলেন, কিন্তু সেযুগের রেওয়াজ মতো এবং কবিগানের রেওয়াজ মতো মাঝে মাঝে তাকেও বদজোবান ছাড়তে হয়েছে, এতে তিনি সেযুগের ইতর-ভদ্র সকল শ্রোতাকেই খুশি করতে পারতেন। একবার আন্টনি কবিগান অরম্ভ হওয়ার আগে ভবানীবিষয় গাইছেন-


‘ ভজনপূজন জানিনে মা, জেতেতে ফিরিঙ্গী।
যদি দয়া করে তারো মোরে এ ভবে মাতঙ্গি।।’

ভোলা ভবানীর জবানীতে জবাব দিলেনঃ


‘ তুই জাত্ ফিরিঙ্গী জবড়জঙ্গী, আমি পারবো নারে তরাতে।
যিশুখ্রীষ্ট ভজ্-গা তুই শ্রীরামপুরের গির্জাতে।।’

তবু বলতেই হবে রামবসুর পর তিনিই কবিগানের ধুনি জ্বালিয়ে রেখেছিলেন বঙ্গে।


আন্টনী ফিরিঙ্গী


নানা কারনে আন্টনী ফিরীঙ্গীর নামটি সাধারনের মধ্যে কৌতহল সৃষ্টি করে।তার প্রথম কারন হয়ত তিনি বাঙ্গালী ছিলেন না, জাতিতে ছিলেন পর্তুগীজ খ্রীষ্টান, স্বভাবে ছিলেন বেপরোয়া এবং বেহিসাবী, সেই সুযোগ নিয়েই তার ভাই তাকে বাবার সম্পত্তি থেকে বেদখল করে।  এক হিন্দু ব্রাহ্মনী বিধবা তাঁর অঙ্কশায়িনী হন, তবে প্রথা মাফিক বিবাহ হয়েছিল কিনা বলা যায় না। তবে এই রমনীর সান্নিধ্য তাকে বাঙ্গালী হিন্দু ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে, এবং তার রচিত যে কয়েকটি গান আমরা পাই, তার থেকেই স্পষ্ট যে তিনি শুধুমাত্র হিন্দু পুরান শাস্ত্র অভিজ্ঞ ছিলেন না, হিন্দু দর্শনেও তার গভীরতা ছিল। গোড়ার দিকে তার একজন বাঁধনদার ছিল, নাম গোরক্ষনাথ। কিন্তু আর্থিক কারনে গোরক্ষনাথ বেঁকে বসলে আন্টনি নিজে গান বাঁধতে শুরু করেন, যা কম উৎকৃষ্ট ছিল বলা যায় না। আগমনী পর্যায়ে তার গান প্রশংসার দাবি রাখে-‘ জয় যোগেন্দ্রজায়া মহামায়া মহিমা অসীম তোমার’

তাঁর লহরের তাৎপর্য সরল, কোথাও কোথাও প্রকাশিত অন্তরের আকুলতা-

‘খ্রীষ্টে আর কৃষ্টে কিছু তফাত নাইরে ভাই।

শুধু নামের ফেরে মানুষ ফেরে  এও কোথা শুনি নাই।।

আমার খোদা যে         হিন্দুর হরি সে

      ঐ দেখ শ্যাম দাঁড়িয়ে আছে

আমার মানবজনম সফল হবে যদি রাঙা চরন পাই।।’

                                    
                                     কলিকাতার আন্টনি প্রতিষ্ঠিত কালীবাড়ি।


অনান্য কবিয়াল
এছাড়াও এযুগের অনান্য কিছু কবিয়ালের নাম আমরা শুনতে পাই তারা হলেন নীলু-রামপ্রসাদ, সাতু রায়,গুরুদয়াল চৌধুরী, মাধব ময়রা, নবাই ঠাকুর, কবি ঈশ্বর গুপ্ত ও তার সুযোগ্য শিষ্য মনোমোহন বসুর নাম করা যেতে পারে।

 তথ্যসুত্র-
১)History of Bengali Language and Literature - D.C. Sen.
2) বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত( ৪র্থ খন্ড)- অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়
৩)পূর্ববঙ্গের কবিগান- ডঃ দীনেশ চন্দ্র সিংহ
৪) প্রাচীন কবিওয়ালার গান- প্রফুল্লচন্দ্র    পাল।
সহযোগিতায়- রবীন্দ্রভারতী সেন্ট্রাল লাইব্রেরী আর RKMIC লাইব্রেরী।

 
চিত্র উৎস- ইন্টারনেট।