Sunday, 8 November 2015

কবিগান৬ঃ- কবিয়াল কথা ১



কবিয়ালদের জীবন সংক্রান্ত প্রথম তথ্য সংগ্রহ করেন ঈশ্বর গুপ্ত। তারপর কবিগান ও তার ইতিহাস নিয়ে যারা কাজ করেছেন, তারা ঈশ্বর গুপ্তের ভাণ্ডার থেকেই রসদ সংগ্রহ করেছেন। তবু পরবর্তী কিছু গ্রন্থও ইতিহাস সংগ্রহের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য যথা-১৩০১ বঙ্গাব্দে দক্ষিণেশ্বর থেকে প্রকাশিত কেদারনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘গুপ্তরত্নোদ্ধার’, ১৩০৩ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত মনুলাল  মিশ্র সংগৃহীত ‘প্রাচীন ওস্তাদি কবিগান’।এছাড়াও পরবর্তীতে ‘প্রীতিগীতি’-১৩০৫, ‘বাঙ্গালীর গান’-১৩১২, ‘প্রাচীন কবিওয়ালার গান’-ইং ১৯৫৮ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
প্রথম পর্ব-( অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে উনবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশক পর্যন্ত)
গোঁজলা গুঁই
গোঁজলা গুঁইয়ের পুর্ববর্তী কোন কবিয়ালের পরিচয় পাওয়া যায় না। আমরা যে সব কবিয়ালের জীবন বৃত্তান্ত অবগত আছি, তাদের মধ্যে ইনিই প্রাচীনতম। সংবাদ প্রভাকরে ঈশ্বর গুপ্ত ১লা অগ্রহায়ন,১২৬১ বঙ্গাব্দে প্রথম এই কবিয়াল সম্পর্কে লেখেন-

“ প্রায় ১৪০ বা ১৫০ বর্ষ গত হইল গোঁজলা গুঁই নামক এক ব্যক্তি পেশাদারী দল করিয়া ধনীদিগের গৃহে গাহনা করিতেন।ঐ ব্যক্তির সহিত কাহার প্রতিযোগীতা হইত জ্ঞাত হইতে পারি নাই। তৎকালে টিকেরার বাদ্যে সঙ্গত হইত।”

গোজলা গুইয়ের নামে দু তিনটি গান প্রচলিত আছে, তার মধ্যে একটি গান এখানে দিলাম-

“ এসো এসো চাঁদবদনি

এ রসে নীরস কোরো না ধনি।।

তোমাতে আমাতে একই অঙ্গ,

তুমি কমলিনী আমি সে ভৃঙ্গ,

অনুমানে বুঝি আমি সে ভুজঙ্গ,

তুমি আমার তায় রতনমণি।।

তোমাতে আমাতে একই কায়া

আমি দেহ প্রাণ, তুমি লো ছায়া,

 আমি মহাপ্রানী তুমি লো মায়া,

মনে মনে ভেবে দেখ আপনি।।”


গোঁজলা গুঁইয়ের শিষ্যত্রয়
ঈশ্বর গুপ্তের ‘সংবাদ প্রভাকর থেকে জানা যায় গোজলা গুইয়ের তিন শিষ্য যথা লালুনন্দলাল, রঘুনাথ দাস, ও রামজী দাসের কথা
লালুনন্দলাল
ঈশ্বর গুপ্ত লালুনন্দলালের একটি গান উল্লেখ করে বলেছেন নন্দলালের ওই গান আজ থেকে আশি বছর আগে অর্থাৎ ওয় গানের রচনাকাল ১৭৭৪ খ্রীঃ।নিতাই বৈরাগী ছিলেন লালু নন্দলালের শিষ্য।
রঘুনাথ দাস
রঘুনাথ দাস গোঁজলা গুঁইয়ের শিষ্য ছিল, কিন্তু গুরু শিষ্য সমসাময়িক ছিলেন,এই অনুমানই সঙ্গত। হরু ঠাকুর (১৭৪৯-১৮১২) এঁর শিষ্য ছিলেন, রাসু-নৃসসিংহও এর শিষ্য ছিলেন। কোন কোন মতে তিনি সৎশুদ্র ছিলেন; কিন্তু ঈশ্বর গুপ্তের মতে তিনি তন্তুবায় শ্রেনীর অন্তরভুক্ত ছিল্রন।তার লেখা খেউড় ছিল আকর্শনীয়।
রামজী দাস
গোজলা গুইয়ের আরেক শিষ্য রামজী দাস সম্মন্ধে প্রায় কিছুই জানা যায় না। ঈশ্বর গুপ্ত বলেছেন রামজী দাসের গান ভবানী বেনে গাইতেন।
ভবানী বনিক (বেনে)
ভবানী বনিক বর্ধমান জেলার গন্ধবনিক বংশে জন্মগ্রহন করেন। পরে কলিকাতার বরাহনগরে এসে বসবাস শুরু করেন।কবির দল গড়ে তিনি খ্যাতি ও অর্থ দুইই উপার্জন করেন।নিতাই বৈরাগী ও ভবানী বেনের কবির লড়াই  সেকালে খুব প্রসিদ্ধ ছিল। নিতে-ভবানীর  লড়াই উপভোগ করতে প্রচুর লোকসমাগম হত।
রাসু- নৃসিংহ
স্বল্প সংখ্যক গানে যদি কেউ স্মরনীয় হয়ে থাকেন তবে তা রাসু নৃসিংহ ভ্রাতৃদ্বয় সেই গৌরবের অধিকারী।এদের গানের কয়েক ছত্র দিলেই তা স্বচ্ছ হবে আপনাদের কাছে, কৃষ্ণ রাধাকে ছেড়ে মথুরায় রাজা হয়ে সুখে আছেন কুব্জাকে নিয়ে, তাই সখীদের অভিযোগ-

“ শ্যাম, আপনারেও যেমন ত্রিভঙ্গ, কালির ভুজঙ্গ কুটিলে।

কুবুজারো অঙ্গ, রসেরো তরং,তাহাতে শ্রীঅঙ্গ ডুবালে।।”


হরু ঠাকুর


কবিয়ালদের গুরুস্থানীয়, হরেকৃষ্ণ দীর্ঘাঙ্গী ১৭৩৮-৩৯ সাল নাগাদ কলিকাতার সিমুলিয়ার ব্রাহ্মণ বংশে জন্মগ্রহন করেন। কবিগানের দুনিয়ায় তিনি হরু ঠাকুর নামেই বিশেষ পরিচিত।ঈশ্বর গুপ্ত থেকে আরম্ভ করে ইদানিন্তকালের লেখকেরাও হরু ঠাকুরের গানের প্রচুর প্রশংসা করেছেন। হরু ঠাকুর ছিলেন কবিগানের  দুনিয়ায়  পিতামহ ভীষ্মের মতো, তাকে ভক্তষিষ্য ও বিদ্রোহীশিষ্য উভয়েই মান্য করত। তার একটি ছত্র, মথুরা গমনোদ্যত কৃষনের প্রতি গোপীদের খেদোক্তি-

“ যদি চলিলে মুরারেই,      ত্যেজে ব্রজপুরী,

     ব্রজনারী কোথা রেখে যাও।

      জীবন উপায় বলে দাও।।” 
       



রাম বসু
 রামমোহন বসু, যিনি রাম বসু নামে পরিচিত ছিলেন, তিনি অপেক্ষাকৃত আধুনিক মানসিকতার ছিলেন, তার গানেও সেই ঝলক ছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় মাত্র বিয়াল্লিস বছর বয়সে ১৮২৮ খ্রীঃ তাঁর অকালমৃত্যু হয়।
তথ্যসুত্র-
১)History of Bengali Language and Literature - D.C. Sen.
2) বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত( ৪র্থ খন্ড)- অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়
৩)পূর্ববঙ্গের কবিগান- ডঃ দীনেশ চন্দ্র সিংহ
৪) প্রাচীন কবিওয়ালার গান- প্রফুল্লচন্দ্র    পাল।
সহযোগিতায়- রবীন্দ্রভারতী সেন্ট্রাল লাইব্রেরী আর RKMIC লাইব্রেরী।

 
চিত্র উৎস- ইন্টারনেট।

1 comment:

  1. খুব সুন্দর ও তথ্য সমৃদ্ধ...

    ReplyDelete