কবিগানের উৎস সন্ধানে......
দুঃখের বিষয় প্রায় পৌনে দুই শ বছর ধরে বিরতিহীন আলোচনা সমালোচনার পরেও একটি বিষয়ে পাঠক ও গবেষকগন এখনো যে তিমিরে সেই তিমিরেই।দেশী, বিদেশী পত্র,পত্রিকা, বইতে কবিগনের উল্লেখ থাকলেও কেউ এখনও এই গঙ্গার ভগীরথ নির্নয় করতে পারেন নি। কবিগানের সূচনা আর প্রাচীনত্ব নিয়ে বিদ্দ্বজ্জন সমাজে মতদ্বৈধতার অন্ত নেই। এ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত উক্তি রকমফের করে বলা যায়-
" হায় রে, কবে কেটে গেছে 'কবিগানের' কাল,
পন্ডিতেরা বিবাদ করে লয়ে তারিখ সাল।" ( সেকাল(ক্ষনিকা)- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)
কবিগানের অংশবিশেষ খেউড় (অনেকে খেঁউড় বা খেঁড়ু ও বলে) গানের সর্বপ্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ভারতচন্দ্রের 'বিদ্যাসুন্দরে', সেখানে বিদ্যার স্বামীকে দেওয়া বারোমাস্যার বর্ননায় আশ্বিন সম্পর্কে বলা হয়েছে-
" আশ্বিনে এদেশে দুর্গা প্রতিমা প্রচার।কে জানে তোমার দেশে তাহার সন্ধান।।নদে শান্তিপুর হৈতে খেঁড়ু আনাইব।নতুন নতুন ঠাটে খেঁড়ু শুনাইব।।"( ভারতচন্দ্রের রচনাবলী,বঃ সাঃ পঃ)
এই বর্ননায় বোঝা যাচ্ছে ভারতচন্দ্রের যুগে নবদ্বীপ আর শান্তিপুরে দুর্গোৎসবে খেঁড়ু গানের আসর বসত। এই খেড়ুগান প্রকৃতিতে ছিল অশ্লীল। কেউ কেউ মনে করেন এই খেঁড়ু গান থেকেই কবিগানের অন্তর্গত খেউড়ের সৃষ্টি। আবার অনেকে মনে করেন যাত্রা থেকেই উৎপত্তি হয়েছে কবিগানের।তবে এইটা মানেন না সেই সংখ্যাটাও কম নয়, তাদেরও যুক্তি কম শক্তিশালী নয়-
প্রথমত, কবিগান যে যাত্রার অংশ ছিল, তার কোন নমুনা পাওয়া যায় না।
দ্বিতীয়ত, কবিগান আর যাত্রার ধরন ধারনে অনেক পার্থক্য।
তৃতীয়ত,একই সময় যাত্রা আর কবিগানের সহাবস্থান, এক থেকে অপরের সৃষ্টিকে প্রশ্নচিহ্নের সামনে দাঁড়া করিয়ে দেয়।
কিছু পন্ডিত মনে করেন, পাঁচালী থেকে কবিগানের উৎপত্তি। কিন্তু কিছু জন ঠিক উল্টোটাই বলেন- কবিগান ভ্রষ্ট হয়েই আধুনিক পাঁচালী। তবে এই বিষয়ে ডঃ হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় সাহিত্যরত্ন মনে করেন পশ্চিমবঙ্গে প্রচলিত ঝুমুর থেকেই কবিগানের জন্ম। এই অভিমতের পিছনে যুক্তিও বেশ ধারালো।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঝুমুরের চারটি ভাগ-
১) সখীসংবাদ( ব্রজলীলা)
২) আগম( ভবানী বিষয়ক)
৩) লহর(শ্লেষ ও ব্যঙ্গ)
৪) খেউড়( অশ্লীল গান)
রাঢ় বঙ্গে নায়ক নায়িকার কথা কাটাকাটি নিয়ে রচিত ঝুমুর গান আজও অনুষ্ঠিত হয়। এই তথ্যই প্রমান দেয়
কবিগানের সঙ্গে ঝুমুর গানের গভীরতর সম্পর্ক আছে, বিশেষত বিষোয়বস্তু, আঙ্গিক ও গায়ন রীতির দিক দিয়ে।
স্থান-কাল-পাত্র
কবিগানের স্থান-কাল-পাত্রের মধ্যে স্থান নিয়ে তেমন মতবিরোধ নেই। কাল সম্পর্কে বিভিন্ন পন্ডিতের বিভিন্ন মত। পাত্র সম্পর্কে খুব বেশী অন্য মত দেখা যায় না।প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ঈশ্বর গুপ্তের নির্দেশিত গোজলা গুঁইকে কবিগানের আদি কবি রূপে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছেঃ যদিও তাঁর রচিত গান মোটেও কবিগানের লক্ষনযুক্ত নয়।বাস্তবিক কবিগান কবে থেকে নির্দিষ্ট রূপ গ্রহন করতে শুরু করেছে বা কার হাতে প্রথম পূর্নতা লাভ করেছে, তা অনুমান সাপেক্ষ।সত্য বলতে একাধিক গবেষক প্রাচীন কবিগানের উপর গবেষণা করে পি .এইচ. ডি উপাধি লাভ করলেও , ঈশ্বর গুপ্ত এর সম্পর্কে যে তথ্য আহরন করেছেন তাঁর চেয়ে বেশিদূর কেউ এগোতে পারিনি। অনেকের ধারণা রবীন্দ্রনাথও এর ব্যতিক্রম নন।
"ইংরেজের নতুন সৃষ্ট রাজধানীতে কবির আশ্রয়দাতা রাজা হইল সর্বসাধারণ নামক স্থুলায়তন ব্যক্তি এবং সেই হঠাৎ রাজার সভার উপযুক্ত গান হইল কবির দলের গান।।..................নতুন রাজধানীর নতূন সমৃদ্ধশালী কর্মশ্রান্ত বণিক সম্প্রদায় সন্ধ্যাবেলা বৈঠক বসিয়া দুই দন্ড আমোদের উত্তেজনা চাহিত। তাহারা সাহিত্য রস চাহিত না।"- কবিসংগীত (লোক্সাহিত্য)-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সাহিত্যরস ছিল কি ছিল না সে আলোচনা ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই করব। কিন্তু কাল সম্পর্কে এই তথ্য মেনে নেওয়া যায় না। কারন ১৬৯০ তে জব চার্নক কলিকাতায় পদার্পন করেন। কিন্তু তার বহু আগে থেকেই বাংলার বিভিন্ন স্থান বিশেষত হুগলী নদীর দুই পারে যথা হুগলী, চন্দননগর,শ্রীরাম্পুর, চুঁচুড়া, সপ্তগ্রাম, সিউড়ি, শান্তিপুর, কৃষ্ণনগর, কাশিম-বাজার প্রভৃতি বর্ধিষ্ণু জন বসতি এলাকায় আসর জমিয়ে বসে ছিল। ১৭৫৭ খ্রীঃ পলাশীর যুদ্ধে পরাজয়ের পর মুর্শিদাবাদে নড়বড়ে রাজনৈতিক রাজধানী থাকলেও বাংলার অর্থনৈতিক রাজধানী কোলকাতায় স্থানান্তরিত হল। তাই পুরানো কেন্দ্রগুলি ছাড়া আরোকিছু নতুন কেন্দ্র গড়ে উঠল যথা শোভাবাজার, হাটখোলা, দর্জিপাড়া,কলটোলা, শিমুলিয়া, ব্রানগরের অনেক ধনাঢ্য বনেদি পরিবার কবিগানের অন্যতম পৃষ্ঠপোষোক হয়ে দাঁড়াল। তৎকালীন নগরকেন্দ্রিক সমাজ জীবন ছিল এদেরই নিয়ন্ত্রনে। সুতরাং রাজা মহারাজাদের ব্রাহ্মন সভাকবির স্থানে নতুন ধনপতিদের সভাকবি হলেন মুচি, গুঁই, বৈরাগী,বেনে, ময়রা প্রভৃতি নিম্নশ্রেনীর থেকে উদ্ভূত কবিকূল।
চিত্র উৎস- ইন্টারনেট, প্রথমটি যাত্রার, দ্বিতীয়টি ঝুমুর, তৃতীয়টি পুরানো কোলকাতার।তথ্যসুত্র-
১)History of Bengali Language and Literature - D.C. Sen.
2) বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত( ৪র্থ খন্ড)- অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়
৩)পূর্ববঙ্গের কবিগান- ডঃ দীনেশ চন্দ্র সিংহ
৪) প্রাচীন কবিওয়ালার গান- প্রফুল্লচন্দ্র পাল।
সহযোগিতায়- রবীন্দ্রভারতী সেন্ট্রাল লাইব্রেরী আর RKMIC লাইব্রেরী।



No comments:
Post a Comment