Thursday, 17 September 2015

কবিগান ১:- শুরুর কথা.................................







" বাঙালীর মতো সঙ্গীতপ্রিয় জাতি আর নেই।.... যে জাতি নৌকা বাহিতে ,ধান কাটিতে, পূজাপার্বনে, এমনকি শ্মশানে মৃতদেহ দাহ করিবার সময় পর্যন্ত গান গাহিয়া থাকে, সে জাতির প্রাণের অভিব্যক্তি যে গান হইবে তাহার আর বিচিত্র কি?"    ( কবির ঝঙ্কার( ভূমিকা)- ধীরেন্দ্রমোহন গঙ্গোপাধ্যায়)

            বাংলাদেশে বিভিন্ন  অঞ্চলে যে সব গান কোন না কোন সময়ে প্রচলিত ছিল বা কিছু কিছু এখনও আছে, তন্মধ্যে- কীর্তন, কবি, সারি, জারি, বাউল, উল্টো বাউল, ভাটিয়ালী, ভাওয়াইয়া,তর্জা, পাঁচালী, টপ্পা, রামপ্রসাদী, কালী কীর্তন, নোউকা বাইচের গান, হাতি খেদার গান, রয়ালী, গাজির গান, ভাদু ,টুসু, চটকা,মুর্শিদা, ক্ষীরোল, ছাত পেটানো গান, ক্ষেত নিড়ানি গান,  মাইজ ভান্ডারীর গান, নবীর গান,  আলকাপ, মারফতী, ঝুমুর, বিয়ের গান, চপগান, যাত্রাগান, গাজন, গম্ভীরা, গৌরগীতি, গুরুভজন, মিলন গান, নীলের গান, বিচ্ছেদি ভাবগান, রাখালিয়া, দেহতত্ত্ব, মনশিক্ষা, মালসী, আগমনী, জাগরনী, ডুমনী, ঘেঁটুর গান, চাকের গান ইত্যাদি  ইত্যাদি বিশেষ উল্লেখযোগ্য ।  সহজ কবিত্ব ও সঙ্গীত প্রিয়তার এত বড় নিদর্শন আর কোন দেশ বা জাতির মধ্যে দেখা যায় না। এখানেই বাংলা ভাষার অভিনবত্ব আর গৌরবও। বাংলা ভাষায় গানই ভালো হয় বলে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ মত প্রকাশ করেছেন। কবিগুরুর মন্ত্যব্যের সমর্থনে বেশি পরিমান সাক্ষ্যপ্রমাণ নিষ্প্রয়োজন।
 হাজার হাজার বছরের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস; হাজার বছরের পুরানো বাংলা গ্রন্থ - চর্যাগীতিকা- প্রথমে সঙ্গীত, পরে হয় তো তা কাব্য নিঃসন্দেহে। এগুলি যে প্রধানত সঙ্গীত তা শিরোনামে লেখা বিভিন্ন রাগ রাগিনীর উল্লেখ দেখেই বোঝা যায়। এবার আসা যাক বাঙালীর সাহিত্য কীর্তির কথায়, বাংলা নয় কিন্তু বাঙালী কবির রচিত সংস্কৃত গ্রন্থ জয়দেবের গীতগোবিন্দম্ ।
      জয়দেবের গীতগোবিন্দম্  সম্পর্কে ডঃ অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর 'বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত' গ্রন্থের ১ম খন্ডে বলেছেন,  
" দ্বাদশ সর্গে সমাপ্ত, উক্তি -প্রত্যুক্তি ও সঙ্গীতময় রাধাকৃষ্ণের মিলনলীলা লইয়া রচিত এই কাব্যের বিষয়বস্তু, রচনাকৌশল ও ভক্তির জন্য সারা ভারতে  অপ্রতিহত প্রাধন্য অর্জন করিয়াছিল।"
তখন সময় ছিল রাজা বাদশাহের, কবিরা আলোকিত করত রাজসভা। অতি প্রাচীন কালেই মহারাজা বিক্রমাদিত্যের  সভা আলোকিত করত মহাকবি কালিদাস, মহাকবি দন্ডী। ত্রয়োদশ  শতাব্দীতে লক্ষন সেনের সভা অলঙ্কৃত করত  জয়দেব। পঞ্চদশ শতাব্দীতে মিথিলা রাজের সভা অলঙ্কৃত করত বিদ্যাপতি। অষ্টদশ শতাব্দীতে মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভায় ছিলেন কবি ভরতচন্দ্র, কবি রামপ্রসাদ সেন। ঠিক এর পরবর্তী সময়েই শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন, গীত গোবিন্দম্, বৈষ্ণব পদাবলীর ভাব অবলম্বন করে কীর্তন, যাত্রা, ঢপ, টপ্পা, পাঁচালী, কথকতা, ঝুমুর প্রভৃতি লোকপ্রিয় গানের সুর রাজসভা থেকে নেমে এসে কাব্য ও গান নানা রঙ পরিগ্রহ করে জনমানসে ছড়িয়ে পড়ে। ' জনসাহিত্য' নামে নতুন শাখার অভ্যুদয়ও এই সময় থেকেই।
সঙ্গীত ও কাব্যের মাধ্যমে উক্তি-প্রত্যুক্তি, প্রশ্নোত্তরের নিদর্শন ভারতের ইতিহাসে প্রাচীন কাল থেকেই কিছু কিছু পাওয়া যায়। রামায়ণ ও মহাভারতের যুদ্ধে বাণ বরিষণের অধিক বাক্য বরিষণই হতো।মহারাজা বিক্রমাদিত্য একদিন  সামনে পড়ে থাকা কাঠের খন্ড দেখিয়ে দন্ডীকে বলেন , ' এটা কি?'। দন্ডী বলেন-" শুষ্কং কাষ্ঠং তিষ্ঠত্যাগ্নে।"
কালিদাস একই প্রশ্নে উত্তর দিলেন- " নীরসঃ  তরুবরঃ পুরতো ভাতি।" এর দ্বারাই কালিদাসের উপস্থাপনের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমানিত হয়ে গেল। একবার কবি রাক্ষস কালিদাসকে কাব্যের লড়াইয়ের আহ্বান জানায়, তিনি বলেন,' তিনি যে অক্ষর সমৃদ্ধ কথায় প্রশ্ন করবেন, সেই অক্ষর সমৃদ্ধ কথায় কালিদাসকে উত্তর দিতে হবে।" কালিদাস প্রস্তাব মেনে নেন।
রাক্ষস বললেন- "  কম্ বলন্তং ন বাধতে শীতঃ।"
কালিদাস উত্তর দিলেন-" কম্বলন্তং ন বাধতে শীতঃ।"
রাক্ষস কবি বললেন-" কা শীতলা প্রবাহিনী গঙ্গা।"
কালিদাস উত্তর দিলেন- " কাশীতলা প্রবাহিনী গঙ্গা।"
রাক্ষস কবি ফের বললেন-" কা মধুরা।"
কালিদাস উত্তর দিলেন- " কামধুরা।"
কালিদাসের কথার উপস্থাপনের মারপ্যাঁচে ধরাশায়ী হলেন রাক্ষস কবি।
এবার  আমি যে উদাহরণটি দিতে চলেছি  তা অষ্টাদশ শতাব্দীর বাংলার বুকে এক কবিযুদ্ধের, যা ঘটেছিল মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভায়; রামপ্রসাদ আর আজু গোঁসাই এর মধ্যে।
রামপ্রসাদ গাইলেন-
        " ডুব দে রে মন কালী বলে,
             হৃদি রত্নাকরের  অগাধ জলে।"

 আজু গোঁসাই উত্তরে গাইলেন-
            " ডুবিসনে মন ঘড়ি ঘড়ি
                  দম আঁটকে যাবে তারাতারি।"

রামপ্রসাদ  অন্যকথায় গাইলেন-
    " আয় মন বেড়াতে যাবি
         কালী কল্পতরু মূলে চারি ফল কুড়ায়ে খাবি।"

 আজু গোঁসাই উত্তরে  বললেন-
     " কেন মন বেড়াতে যাবি?
           কারও কথায় যাসনে কোথাও
             মাঠের মাঝে মারা যাবি।"
একথা নিশ্চয়ই সকলে মেনে নেবেন , চাষের জমিতে সব সময় পর্যাপ্ত আর উন্নত ফসল ফলবে তাঁর কোন নিশ্চয়তা নেই, এইকথাটি সাহিত্যের ক্ষেত্রেও ঠিক ততটাই প্রযোজ্য। এতদিন কবিরা ছিলেন জনগণের ধরাছোঁয়ার বাইরে, রাজদরবারে সভাসদ রূপে। এবার তাঁরা নেমে এলেন জন দরবারে। বীনার ঝংকার, সেতারের গুঞ্জনের পরিবর্তে একেবারে দেশী ঢোল কাঁসির আওয়াজে আসর সরগরম হল।রাজপথ থেকে জনপথে অবতরণের ফলে সভাগায়ক আর সভাকবির সমন্বয়ে সৃষ্টি হল কবিয়াল ও কবিগান। কবি শুধু রচনাই করবেন না, সঙ্গে সঙ্গে গাইয়েও শোনাবেন। কবির রচনা আবৃত্তিতে তৃপ্তি যারা পায় না, তাদের মনোরঞ্জনের জন্য পুনরাবৃত্তির গান- তাই কবিগান।
চিত্রটি কবিগানের উপর  হওয়া আধুনিক একটি সিনেমাঃ-জাতিস্বর: A Musical of Memories' থেকে গৃহিত।
তথ্যসুত্রঃ-
পূর্ব বঙ্গের কবিগান( ১ম খন্ড)- ডঃ দীনেশ চন্দ্র সিংহ (প্রকাশক- কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়)
বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত ( ১ম খন্ড)- ডঃ অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় 
কবির ঝঙ্কার  - ধীরেন্দ্রমোহন গঙ্গোপাধ্যায়
কবিগান- দীপক বিশ্বাস।
সহযোগিতায়- রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার এবং রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অব কালচার লাইব্রেরী, গোলপার্ক।

No comments:

Post a Comment